বিশ্বের সমস্যাগুলির জন্য শুধুমাত্র মুসলমানদেরকে দোষারোপ বন্ধ করার সময় এসেছে।

আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্ব নেতা বলেন,  বিশ্বের সমস্যাগুলির জন্য শুধুমাত্র মুসলমানদের ওপর দোষারোপ বন্ধ করার সময় এসেছে।

আলোচ্য অনুষ্ঠানে হুযূর আনোয়ার (আই.) মস্কো ও রাশিয়ার শিশু বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিলের চেয়ারম্যান ডা. লিওনিড রোসালকে দুর্যোগ ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং আর্তমানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পক্ষ থেকে পুরুস্কার প্রদান করেন।পুরুস্কারটি তার প্রতিনিধি হিসেবে আঞ্জেলিনা এলেকসিভা গ্রহন করেন।

১৫তম বার্ষিক শান্তি সম্মেলনে হুযুর হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেছেন, বৈষম্য, চরম দারিদ্র্য, আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্য ও বৈষম্যমূলক বৈদেশিক নীতিগুলো মৌলবাদের প্রধান চালিকা শক্তি।

খলিফাতুল মসীহ্ (আই.) অতীতের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আমাদের  যতদূর সম্ভব জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি (আই.) প্রমাণ করেন, ইসলাম সকল ধরনের চরমপন্থা এবং বর্তমানের  ‘ভূ-রাজনৈতিক’ বিরোধকে প্রত্যাখ্যান করে যা কোনক্রমেই ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়।মুসলিম নেতার মতে, অদূরদর্শিতা এবং সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারনে বিশ্ব শক্তিগুলো  আজ অন্ধ হতে চলেছে। গত ১৯ মার্চ, ২০১৮  আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্ব প্রধান ও পঞ্চম খলীফা হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) আহমদীয়া মুসলিম জামাত, যুক্তরাজ্য কর্তৃক আয়োজিত ১৫ তম জাতীয় শান্তি সম্মেলনে মূল বক্তব্য প্রদান করেন।এই অনুষ্ঠানটি লন্ডনের বাইতুল ফুতুহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে  ৩১ টি দেশ থেকে আগত নয় শতাধিক শ্রোতামণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন যার মধ্যে রয়েছেন ৫৭০ জন অ-আহমদী অতিথি, বিভিন্ন দেশে মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।  আলোচ্য অনুষ্ঠানে হুযূর আনোয়ার (আই.) মস্কো ও রাশিয়ার শিশু বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিলের চেয়ারম্যান ডা. লিওনিড রোসালকে দুর্যোগ ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং আর্তমানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পক্ষ থেকে পুরুস্কার প্রদান করেন।পুরুস্কারটি তার প্রতিনিধি হিসেবে আঞ্জেলিনা এলেকসিভা গ্রহন করেন।    হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) তাঁর ভাষণে বলেন, আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায় বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রসারের চেষ্টায় কোন প্রকার ত্রুটি রাখবে না। তিনি (আই.) বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং সরকারদের  “তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন” এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণের দুর্ভোগকে সহজতর করার জন্য আহ্বান জানান।হুযুর আনোয়ার (আই.) নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাণিজ্যকে নিন্দা জানিয়েছেন এবং যে সব জাতি অস্ত্র তৈরি করছে এবং দেশগুলোকে রণক্ষেত্রে পরিনত করছে তাদের হাত রক্তাক্ত  বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি (আই.) আরও বলেন, চরম দারিদ্র্য বা দ্বন্দ্বের মাঝে জন্মগ্রহণকারী শিশুরাই সন্ত্রাসী নিয়োগকারীদের জন্য সহজ এবং ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষ্য। তিনি (আই.) মুসলমানদের মধ্যে চরমপন্থার ঝুঁকি এবং অদূর ভবিষ্যতে জাতীয়তাবাদীদের ক্রমবর্ধমান হুমকির কথা বলেন। তিনি (আই.) ইসলামি শিক্ষাকে সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থার পরিপন্থী বলে দাবি করেন।  আহমদীয়া মুসলিম জামাতের অবিলম্বে  শান্তি প্রসারের প্রচেষ্টা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে হযরত মির্যা মসরূর  আহমদ (আই.) বলেন:  আমাদের বিশ্বাস আমাদেরকে বিশ্বজুড়ে ধনী বা দরিদ্র, শক্তিশালী বা নিপীড়িত, ধার্মিক বা অধার্মিক, কল প্রজন্মের কাছে শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে বৈশ্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে  হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন:“সাম্প্রতিক সময়ে, এমন এক সমস্যা যা অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা বিতর্ক ও প্রচারাভিযান করছেন, তা হল জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশেষত কার্বন নির্গমন হ্রাস। অবশ্যই, পরিবেশ রক্ষা এবং আমাদের গ্রহের যত্ন করার প্রচেষ্টা একটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং উন্নতির কারণ। তবুও একই সময়ে, উন্নত বিশ্বে এবং বিশেষ করে বিশ্ব নেতাদের অন্যান্য সমস্যা গুলোও উপলব্ধি করে সমান গুরুত্বের সাথে তা মোকাবিলা করা উচিত।’’   তিনি (আই.) আরও বলেন :“বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলিতে বসবাসকারী গরিবেরা পরিবেশ বা কার্বন নির্গমনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান নিয়ে চিন্তা করে না; বরং, তারা ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন একথাই চিন্তা করে যে, তাদের সন্তানদের মুখে এক মুঠো খাবার তুলে দিতে পারবে কি না ।” দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্যের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে হুযুর (আই.)  বলেন:“আমাদের এসব কষ্টকে সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করা উচিৎ নয়। এর পরিবর্তে, আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এই ধরনের দারিদ্র্যতা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করছে যা কিনা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সত্য কথা হল, এই ছেলেমেয়েদের কোন বিকল্প উপায় নেই, তারা স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে বা যে কোন ধরনের শিক্ষা লাভের পরিবর্তে তাদের পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহে সময় ব্যয় করে। তারা নিরক্ষরতা এবং দারিদ্ররূপী একটি বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে আটকে আছে যা সমাজের জন্য উপযুক্ত নয় বরং সমাজকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।” হুযূর আকদাস (আই.)বলেন:“হতাশা চরমপন্থীদের দ্বারা লুণ্ঠিত হচ্ছে, তারা আর্থিক পুরষ্কারের মাধ্যমে দরিদ্রদের প্রলুব্ধ করছে এবং তাদের পরিবারের জন্য একটি উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। একইভাবে, অশিক্ষিত যুবকদের লক্ষে পরিনত করার মানে হচ্ছে, চরমপন্থীরা তাদের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের মগজ ধোলাই করে।”  হুযূর (আই.) আরও বলেছেন:“দরিদ্র দেশগুলোকে অবজ্ঞা করা উচিত নয় বরং তাদেরকে আমাদের ভাই ও বোনের মত পরিবারের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। উন্নয়নশীল দেশের মানুষদের সুযোগ প্রদান করে এবং আশার আলো দেখিয়ে তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদেরকেই সাহায্য করব এবং সমগ্র পৃথিবীর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা প্রদান করব।” জাতীয়তাবাদের উত্থানের এবং পশ্চিমা বিশ্বের অদূরবর্তী হুমকির কথা উল্লেখ করে হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন:“সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার ফলে এবং পাশ্চাত্বে ব্যাপক অভিবাসন এর ফলে অনেক পশ্চিমা দেশে জাতীয়তাবাদ বিপজ্জনক ভাবে বৃদ্ধিলাভ করছে, যা কিনা অতীতের অন্ধকার দিনগুলোর মতো ভীতি প্রদর্শন করছে। এটি বিশেষভাবে বিরক্তিকর যে, ডানপন্থী দলগুলো  মৌখিকভাবে বৃদ্ধিলাভ করছে এবং তাদের সদস্যপদ বৃদ্ধি পেতে দেখছে এমনকি রাজনৈতিকভাবে লাভবানও হচ্ছে। তারাও চরমপন্থী, যারা পশ্চিমা সমাজকে বিষাক্ত করার চেষ্টা করে এবং ভিন্ন মতাবলম্বী ও ভিন্ন বর্ণের লোকদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়াতে চেষ্টা করে।”তিনি (আই.) আরও বলেন:“উপরন্তু, কতিপয় শক্তিশালী বিশ্ব নেতার বাচনভঙ্গি ক্রমশ জাতীয়তাবাদী এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, তারা অন্যদের চেয়ে তাদের নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রদানে বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি এই বিষয়টি অস্বীকার করি না যে, সরকার ও নেতাদের দায়িত্ব তাদের নিজেদের অধিবাসীদের দেখাশোনা করা এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা। অবশ্যই ন্যায়বিচারের সাথে কাজ করা, এবং অন্যদের অধিকার লঙ্ঘন না করে নাগরিকদের জীবনযাত্রার উন্নতির লক্ষ্যে চেষ্টা করা নেতাদের একটি মহ্ৎ গুণ। যাহোক, স্বার্থপরতা, লোভ এবং অন্যদের অধিকার খর্ব করার উপর যে রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে তা ভুল এবং এগুলো বিরোধ ও বিশ্বকে বিভক্ত করার সূচনা করছে।” তিনি (আই.) আন্তর্জাতিক অস্ত্রের ব্যবসায় যে প্রতারণা নিহিত আছে এবং বিশ্বজগত যে বিপদের সম্মুখিন তা উল্লেখ করেন। তাদের জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে, বিশ্ব শক্তিগুলো  “অমানবিক” অস্ত্র বিক্রি করছে তা শহরের পর শহর ধ্বংস করে ফেলছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যতকে অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন করছে। তিনি (আই.) বলেন, সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে সরকারি সৈন্যরা বিদ্রোহ করছে ও সন্ত্রাসীরা  একে অপরের সাথে লড়াই করছে কিন্তু তাদের  সকলের স্বার্থের ক্ষেত্রে  একটি বিষয় এক ও অভীন্ন আর তা হল, তাদের অস্ত্রের অধিকাংশই উন্নত বিশ্বে তৈরি হচ্ছে।  হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:“পরাশক্তিগুলো যে অস্ত্র বাণিজ্য করছে তা প্রকাশ্যে এবং বেশ গর্বের সাথে করছে আর নিঃসন্দেহে নির্দোষ মানুষকে হত্যা, নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার জন্য তা ব্যবহার করা হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য যে, এ ধরনের জাতিগুলি কোন পরিণতির কথা না ভেবেই অবিরাম কেবল তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং দেশীও মূলধন বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। তারা অস্ত্র বিক্রি করার জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য চুক্তি করতে চায় অথচ সেই অস্ত্রগুলো নির্দোষ ও দোষী নির্বিশেষে সবার হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা গর্বের সাথে অস্ত্র বিক্রি করে এবং শিশু, নারী বা দুর্বল কাউকেও বাদ রাখে না। তারা লজ্জা-শরমের বালাই না করে অস্ত্র  বিক্রি করে এবং কোন বাছবিচার ছাড়াই শহরের পর শহর অবরোধ করে এবং তা ধ্বংস করে দেয়।” হুযূর (আই.) বলেন:“অগণিত শিশুরা চরম নিষ্ঠুর ও অমানবিকভাবে তাদের বাবা-মাকে হত্যা হতে দেখেছে এবং তারা বিস্মিত হয়ে শুধু ভাবে কেন তাদের বাবা-মা তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। হাজার হাজার নারী বিধবা, হতাশা ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞতা  থেকে  ভাল কোন ফলাফল আসতে পারে কী? আমি দেখতে পাচ্ছি যারা বিশ্বের শান্তি বিনষ্ট করার চেষ্টায় রত তারাই শিশুদের এই প্রজন্মটির হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে।” তিনি (আই.) বলেন, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে এমন কতিপয় কিশোর ও তরুণ বিমান হামলার দরুন অনাথ হয়েছিল। এই তরুনদের সক্রিয় হতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং চরমপন্থার দিকে টানা হচ্ছে। হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:“স্কুলে যাওয়া, শিক্ষার ব্যবস্থা করা, সুন্দরভাবে বেড়ে উঠা, আইন মান্যকারী সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পরিবর্তে, শিশুদের এই প্রজন্মটিকে কীভাবে গ্রেনেড বা রকেট ল্যাঞ্চার চালাতে হয়, কীভাবে আত্মঘাতী হামলা করা যায় এবং কীভাবে প্রতিহিংসার কারণে বিশ্বকে ধ্বংস করা যায় এই শিক্ষা দেয়া হয়।”
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) আরও বলেন: “শুরুতে, আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং যে বায়ুতে আমরা নিঃশ্বাস নেই একে পরিশুদ্ধ রাখা। কেউ যদি মনে করে যে, ভারী বোমা বিস্ফোরণ বায়ুমণ্ডলে কোন প্রভাব ফেলে না? উপরন্তু,  যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলিতে শান্তি বিরাজ করছে।  তবে তাদের শহর ও নগরগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে,  এবং এই  বিশাল নির্মাণযজ্ঞ হতে প্রচুর  ক্ষতিকর গ্যাস  নির্গমন হবে এবং বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাবে। এভাবে, একদিকে, আমরা পৃথিবী নামক গ্রহটি সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি এবং অন্য দিকে অর্থহীনভাবে  আমরা এটিকে ধ্বংস করছি। এর আলোকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বিশ্ব পরাশক্তিগুলো অদূরদর্শিতা এবং সঙ্কীর্ণ মনমানসিকতার কারনে আজ অন্ধ হতে চলেছে।তিনি (আই.) পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি বৈদেশিক নীতির ত্রুটির কথা বারংবার উল্লেখ করেন। তিনি (আই.) বলেন, ইরাকে যুদ্ধ বা আগ্রাসণের অব্যবহিত পরেই তারা অনুধাবন করেছে যে, তাদের অভিযোগ ভুল ছিল। ২০১১ সালে লিবিয়ায় “চরমপন্থা জোরদার” হয়ে উঠছে বলে যে হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল তাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে।  হুযূর (আই.) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা সম্পর্কে সতর্ক করেন। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে তবুও  তিনি (আই.) সতর্ক করে বলেন, এই চুক্তির কোনও নিশ্চয়তা নেই, কারণ উভয় পক্ষই ঘৃণার বিষবাষ্পে জর্জরিত।তিনি (আই.) বলেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয় তবে তা রক্ষা করার মতো কোন গ্যারান্টি থাকবে না এবং এই বিষয়ে হুযূর (আই.) সূতার ন্যায় ঝুলন্ত কয়েক বছর আগের ইরানের পারমাণবিক চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সকল জাতির নেতাদের এবং তাদের প্রতিনিধিদের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ও তীব্র উত্তেজনা হ্রাসের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান।  ক্রমবর্ধমান বস্তুবাদিতা থেকে দূরে সরে যাওয়া, মানবতার প্রতি সহানুভূতি এবং সবার জন্য সাম্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানিয়ে হযরত মির্যা  মসরূর আহমদ (আই.) বলেন: “যদি আমরা আমাদের সন্তানদের আশার উত্তরাধিকারী করে যেতে চাই এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের দায়িত্ব দিয়ে যেতে চাই, তবে আমাদের ধর্ম বা বিশ্বাস যাই হোক না কেন, আমাদের অগ্রাধিকারগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করতে হবে। বস্তুবাদ ও ক্ষমতার লোভের পরিবর্তে, প্রত্যেক জাতি, ধনী হোক বা দরিদ্র সারা বিশ্বের সবার ওপরে শান্তি ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অস্ত্রের দৌরাত্ত্বের পরিবর্তে, মৃত্যু ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, আমাদেরকে মানবতাকে বাঁচানোর এবং একে রক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।” খলীফাতুল মসীহ্ (আই.) বলেছেন:“যুদ্ধরত দেশগুলোতে সীমান্ত এবং বন্দর বন্ধ করার পরিবর্তে, অনাহারে থাকা নিষ্পাপ শিশু এবং চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত অসুস্থদের প্রতি আমাদের উম্মুক্ত হৃদয় নিয়ে অগ্রসর হতে হবে এবং যে দেওয়ালগুলো আমাদের বিভক্ত করেছে সেগুলো ভেঙে ফেলুন, ক্ষুধার্তদের খাবার দিন এবং যারা কষ্টে আছে তাদের সাহায্য করুন।” ইসলামের নামে পরিচালিত চরমপন্থীদের নিন্দা করে হুযূর আকদাস (আই.) বলেন:“যদিও তথাকথিত মুসলমান সন্ত্রাসীরা ইসলামের নামে কাজ করার দাবি করে, আমি বিশ্বাস করি না যে, আমরা কোন ধর্মীয় যুদ্ধ দেখছি বরং, যুদ্ধ যুদ্ধই, যেখানে শুধুমাত্র ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যেই অত্যাচার চালানো হয়। তথাকথিত জিহাদী সন্ত্রাসীরা এবং চরমপন্থী ধর্মীয় নেতারা কেবলমাত্র ইসলামের নাম ম্লান করছে এবং শান্তিপূর্ণ ও আইন মান্যকারী অধিকাংশ মুসলমানে চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্থ করছে।” হুযূর (আই.) আরও বলেন:“যদিও সমাজকে ব্যাপকভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য আমি কিছু মুসলমানের মন্দ কাজ ভূমিকা রাখছে বলে স্বীকার করছি। তবে আমি একথা বিশ্বাস করি করি না যে, শুধুমাত্র মুসলমানরাই বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী। এখন একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুসলমানরাও বিশ্বের সমস্যাগুলির জন্য দায়ী কেননা, তারা নিজেদের মানবতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।”  হুযূর (আই.) ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) -এর উদাহরণ  টেনে বক্তব্য শেষ করেছেন। তিনি (আই.) হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর মক্কার মুসলমান অনুসারীদের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, মুসলমানদের শহীদ করা হয়েছিল, তাদের জ্বলন্ত কয়লার উপর শুইয়ে রাখা হয়েছিল এবং মুসলমান নারীদের বিপরীত প্রান্তে দৌড়ান উটের সাথে বেঁধে দিয়ে  তাদের দেহগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।  বিজয় লাভের পর মহানবী (সা.)-এর মক্কায় ফেরত আসা সম্পর্কে হুযূর (আই.) বলেন, “যখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয় করেন, তখন তিনি প্রতিশোধের জন্য এক ফোটা রক্তপাতও করেন নি বরং আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের ভিত্তিতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি (সা.) সব অত্যাচারী ও যারা তীব্রভাবে ইসলামের বিরোধিতা করেছিল, তাদের সবাইকে সাধারণ ক্ষমা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন, ইসলামী শাসন নীতি অনুযায়ী, সকল মানুষ কোন প্রকার হস্তক্ষেপ বা ভয়-ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম ও বিশ্বাস লালন-পালন করতে পারবে।তাঁর (সা.) একমাত্র শর্ত ছিল, সমাজের প্রতিটি সদস্যকে শান্তি বজায় রাখতে হবে। তিনি (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, জাতি, ধর্ম  বর্ণ নির্বিশেষে যেন সবার অধিকার রক্ষা করা হয় এবং সবাইকে প্রাপ্য সম্মান প্রদান করা হয়।” হুযূর (আই.) বলেন: “এই হল ইসলামের প্রিয়নবী ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুপম এবং মহৎ উদাহরণ এবং এটি সমবেদনা, অনুগ্রহ ও রহমত যা আজ বিশ্বের  সকল মুসলমান ও অমুসলমানকে গ্রহণ করতে হবে। ক্ষমা এবং অনুগ্রহের এই নীতি ও আদর্শ ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র অর্থাৎ সকল দেশে বিকশিত হওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র এরপরই দীর্ঘমেয়াদী শান্তি অর্জন করা সম্ভব।” হুযূরের মূল বক্তব্যের আগে  বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ বিশ্বের শান্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করেন।আহমদীয়া মুসলিম জামাত, যুক্তরাজ্যের জাতীয় আমীর রফিক আহমদ হায়াত বলেন: “আমাদের বিশ্বাসের বিপক্ষে তাদের যে বিশ্বাস আছে তা ঐক্যের পরিবর্তে বিরোধের বীজ বপন করে। যারা ঘৃণা প্রকাশ করে তাদের কাছে আমাদের বার্তাটি স্পষ্ট, চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদ কখনো সফল হবে না এবং যুক্তি ও ঐক্যের মাধ্যমে আমরা একে পরাজিত করব।” ড. হারুন রোডস, একজন প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী,  স্বাধীনতা অধিকার রক্ষা প্রকল্পের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ইউরোপের ধর্মীয় স্বাধীনতা ফোরামের সভাপতি পাকিস্তানে আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেন। ড. হারুন রোডস আরো বলেন: “আমি পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশে আহমদী মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। নৈতিক ও সামাজিক সাফল্যের জন্য আপনাদের সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আপনারা সবার জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর জোর দেন, কিন্তু আপনি যদি আপনার গৌরবময় ও পবিত্র অঙ্গীকার বা বিশ্বাস ত্যাগ না করেন তবে ভোট দেওয়ার অধিকার এবং অন্যান্য নাগরিক অধিকার খর্ব করা হয়।আপনারা আইনের শাসনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু হত্যা, নির্যাতন এবং বৈষম্য সহ্য করেন, কারণ এক্ষেত্রে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং তারা রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উৎসাহ পায় আর থাকে সুরক্ষিত। আপনি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন কিন্তু আপনি যদি আপনার বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠে প্রকাশ করেন তবে আপনাকে অস্বীকার করা হয়, বাঁধা দেয়া হয় এমনিক শাস্তিও দেয়া হয়। আপনি বহিষ্কৃত হন এবং আপনার অধিকার হরণ করা হয়।” ড. লুইজি ডি সালভিয়া,  ইউরোপের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় শান্তি সম্মেলনের সহ সভাপতি বলেন: “আপনারা ১৫ বছর ধরে এই যে শান্তি সম্মেলনটি আয়োজন করছেন এটি আমাদের মহাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রতিফলন  হিসেবে নিবেদিত এবং সাধারণ কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত অঙ্গীকার।  ধর্মীয় চরমপন্থীদের দ্বারা নিপীড়িত-নির্যাতিত আমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে আমি ভ্রাতৃত্বের সংহতি প্রকাশ করতে চাই। আমরা সবসময় ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় আপনাদের পাশে আছি।”  শান্তির অগ্রগতির জন্য আহমদীয়া মুসলিম পুরস্কার প্রাপ্ত ড. লিওনিড রোশালের প্রতিনিধি মিসেস. এঞ্জেলিনা আলেকসেভা বলেন, “প্রত্যেকের বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন ড. রোশেল তার পুরুস্কারটি একটি দাতব্য সংস্থাকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা মস্তিষ্কের আঘাত এবং মেরুদন্ডের মারাত্মক আঘাতজনিত কারণে অসুস্থ শিশুদের সাহায্য করে।” হুযূর (আই.)-এর নীরব দোয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয় অনুষ্ঠানটির পূর্বে ও পরে হুযূর (আই.) বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সাথে একটি সংবাদ সম্মেলনে যোগদান করেন। (www.voiceofislambangla.com )